আমাদের বাসায় এক আন্টি ভাড়া থাকে। উনার দুইটা বাচ্চা৷ এক ছেলে এক মেয়ে। বড়
মেয়েটা এবার ক্লাস ফোরে উঠছে৷ তো এই আন্টি সেদিন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিছে,
'আলহামদুলিল্লাহ,
প্রাউড টু বি আ ভার্জিন।'
.
তো স্বাভাবিকভাবেই স্ট্যাটাসে প্রচুর হাহা রিয়্যাক্ট পড়েছে। একজন দেখি কমেন্ট করছে, 'আন্টি, আঙ্কেলও কি ভার্জিন নাকি?'
আন্টি সেখানে রিপ্লাই দিছে, 'হ্যা, আমরা ফ্যামিলির সবাই ভার্জিন।'
কি একটা অবস্থা। আন্টি তার ফেসবুক ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ রেসপন্স এই
স্ট্যাটাসে পেয়ে গেছে৷ যেখানে প্রোফাইল পিকচার দিলে উনি টেনেটুনে ত্রিশটা
রিয়্যাক্ট পায় সেখানে এই পোস্টে সাড়ে তিনশো হাহা, দেড়শো কমেন্ট। পুরাই যা
তা অবস্থা।
এক ফাজিল পোলা কমেন্ট করছে, 'আমি আপনার ভার্জিনিটি ভাঙতে চাই।'
আন্টি ওখানে রিপ্লাই দিছে, 'এতো সস্তা না আমার ভার্জিনিটি। আমার স্কুলের
সব ক্লাসমেট ট্রাই করছে, শ্বশুরবাড়ির সবাই ট্রাই করছে, কিন্তু কেউ কিছু
করতে পারেনাই। আমি অলওয়েজ ভার্জিন ছিলাম, আছি, থাকবো।'
.
তো এই
স্ট্যাটাসে এতো হাহা রিয়্যাক্ট পেয়ে কোনো এক বিচিত্র কারণে আন্টি খুব কষ্ট
পাইছে। এদিকে উনার ফোন বা ফেসবুকের কোনো সমস্যা হলেই আমার কাছে নিয়ে আসে।
তবে উনার সমস্যাগুলোও অদ্ভুত অদ্ভুত হয় বেশিরভাগ সময়। কয়েকদিন আগে এসে
বলতেছে, 'দেখ তো আমার এক ফেসবুক বন্ধু ইনবক্সে নুডস চাইতেছে এখন কি করি?
কিভাবে পাঠাবো? রোজা রমজানে একটা জিনিস চাইছে, না করি কিভাবে?'
.
আমি তো পুরাই মদনা হয়ে গেছি। এই মহিলা কি বলে? মাথা ঠিক আছে? জিজ্ঞেস করছি,
'আঙ্কেল যদি জানে আপনার ইনবক্সে কেউ নুডস চাইছে তাহলে কি হবে?'
আন্টির
নির্লিপ্ত জবাব, 'কি আর হবে? তোমার আঙ্কেলরে তো চেনোনা। সে নিজেই ডেইলি
ডেইলি সন্ধ্যার পর দুই তিনটা ফ্রেন্ড বাসায় নিয়ে এসে বলবে ওরা তোমার নুডসের
লোভে আসছে। যদিও আমি জানি বন্ধুদের চাইতে লোভটা তার নিজেরই বেশি। তো
বন্ধুদের যখন নিয়ে আসছে, সবাইকেই দিতে হয়।'
- সিরিয়াসলি? আমাকে দেখাবেন আপনার নুডস?
- হ্যা অবশ্যই, শুধু দেখাবো কি বোকা ছেলে। খাওয়াবোও।
- সত্যি? আপনি সত্যি বলছেন?
- হ্যা, আশ্চর্য! মিথ্যা কেন বলবো। তুমি সন্ধ্যার পর বাসায় আইসো তোমাকে খাওয়াবো। তোমার কি নুডস পছন্দ? ম্যাগি না কোকোলা?
.
শিট, উনি এতোক্ষণ নুডস বলতে নুডলস বুঝাইছে! আমি যারপরনাই হতাশ হলাম।
বললাম, আন্টি ঐটা নুডলস। আন্টি অবাক হয়ে বলতেছে, 'কই, আমরা তো নুডুস বলি।
আমার ছোট ছেলেটা অবশ্য বলে লুডুস।'
আমার প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হলো। ফুল ফ্যামিলি অশিক্ষিত হলে যা হয় আরকি!
.
তো ভার্জিনিটিওয়ালা পোস্টে এতো হাহা পেয়ে আন্টি আমার কাছে আসছে। বলতেছে, 'দেখ তো সবাই এতো হাহা কেন দিচ্ছে?'
আমি কি বলব? বললাম, 'মেবি আপনার লিস্টের কেউ বিশ্বাস করেনাই যে আপনি ভার্জিন। এজন্য হাহা দিছে।'
আন্টি এই কথা শুনে খুব কষ্ট পাইছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতেছে, 'আমি ভার্জিন
না? আমি? মানুষ এটা কিভাবে ভাবতে পারে! তুমি জানো আমি জীবনে কোনো মানুষের
একফোটা ক্ষতি করিনাই৷ কখনো মিথ্যা কথা বলিনি। কেউ বলতে পারবেনা কোনোদিন
কারো থেকে একটা টাকা না বলে নিছি। কারো সাতে পাঁচে নাই। মুরব্বীদের মুখের
দিকে তাকায়ে কথা বলিনা কখনো। ঝগড়াঝাটি থেকে দূরে থাকি সবসময়। আর আমি
ভার্জিন না?'
তো কিছুক্ষণ কথা বলে আমি বুঝলাম যে কাহিনী নুডসের মতোই।
আন্টির ধারণা ভার্জিন শব্দের অর্থ সৎ। এর কারণ কে একবার আন্টির সামনে
বলছিলো, 'অমুক ভার্জিন না। সে অসৎ।' সেই থেকে আন্টি জানছে যে ভার্জিন থাকা
মানে সৎ থাকা। উনার থেকেই জানলাম, উনার ফ্রেন্ডরা অনেকবার উনাকে ক্লাস
পালানো, সিগারেট খাওয়া, বাসায় মিথ্যা বলে ঘুরতে যাওয়া টাইপ অনেক অসৎ কাজ
করার প্ররোচনা দিয়েছিলো৷ কিন্তু উনি তাদের কথা শুনেননাই। সবসময় সৎ অর্থ্যাৎ
ভার্জিন থেকেছেন। শ্বশুরবাড়ির অনেকের কথাতেও কখনো ভার্জিনিটি ল্যুজ করেন
নাই।'
.
আন্টির ছোটবোনের বিয়ে ভেঙে গেছিলো বিয়ের দিন। সেই কাহিনীও
জানলাম। উনি জাস্ট মজা করে বরপক্ষের কারে যেন বলছিলেন, 'তোমাদের বৌমার কথা
আর কি বলব। স্কুল কলেজে থাকতে যা দুষ্টু ছিলো। এমন কোনো দুষ্টামি আছে যা
করেনাই সে। একদম ভার্জিন ছিলো না। বাট যত বড় হইছে মাশাল্লাহ এখন অনেক
ভার্জিন।'
তো বরপক্ষ এই কথা শুনে তখনই বিয়ে ভেঙে দিছে। আন্টি সেজন্য
এখন নিজেকে আরো বেশি ভার্জিন দাবী করে। যাতে উনার বিয়ে না ভাঙ্গে। তবে উনার
নাকি ভাগ্য ভালো। গর্ব করে বলতেছে, 'তোমার আঙ্কেলও যথেষ্ট ভার্জিন। কারো
সাথে কোনো গ্যাঞ্জাম নাই। আজকাল এরকম ভার্জিন ছেলে কই পাওয়া যায় বলো!'
.
আসলেই পাওয়া যায় না, বললাম আমি। আপনারা কত সৎ, আইমিন কত ভার্জিন। আন্টি
হাসলেন। বললেন, 'দোয়া করো এভাবেই যেন সারাজীবন ভার্জিন থাকতে পারি।'
.
এই ঘটনার কয়েকদিন পর আরেক কাহিনী ঘটছে। আন্টির ক্লাস ফোরে পড়া পিচ্চি মেয়ে
ছাদে আসছে। আমিও ছাদে। এখন ছাদে কারা যেন আচার শুকাতে দিছে। সম্ভবত
নীচতলার অন্য ভাড়াটিয়াদের কাজ। তো পিচ্চি আমারে বলে, ভাইয়া আচার খাবো।
আমি বলছি, 'আরে আচার তো আমাদের না। তবে সমস্যা নাই। তুমি ছোট মানুষ খেতে
চাইছো এক কাজ করবা। যখন ছাদে কেউ থাকবে না আস্তে করে এসে আচার খেয়ে চলে
যাবা।'
.
এই মেয়ে সেদিন দুপুরেই লুকায়ে আচার চুরি করতে গিয়ে তার
মায়ের হাতে ধরা খাইছে। ধরা খেয়ে আমার কথা বলছে। বলছে, 'সোহাইল ভাই আমাকে
বুদ্ধি দিছে এভাবে চুরি করে খাওয়ার।'
ওর আম্মু খুব রেগে গেছে। আমার
কাছে এসে বলতেছে, 'তুমি এইটা কেন করলা? তোমার জন্য আমার মেয়েটা আর ভার্জিন
থাকলো না। ও তো ছোট মানুষ, তুমি ওকে শিখাইছো এখন তুমিও আর আজ থেকে ভার্জিন
থাকলা না।'
আমি দেখলাম এইবার তো বিশাল ঝামেলায় পড়তে যাচ্ছি আমি। এতোদিন
ঠিক ছিলো কিন্তু এই কথা মানুষ শুনলে আমি পুরাই শেষ। এমনিতেই যে পরিমানে
ধর্ষক বেড়ে গেছে তাতে অবিশ্বাসও করবেনা কেউ।
আমি দ্রুত আন্টিরে
ভার্জিনের আসল মানে বুঝাতে যাবো এমন সময় দেখি আঙ্কেল মানে উনার হাজবেন্ট
আসতেছে। উনি আমার সামনেই আঙ্কেলের দিকে তাকায় বলতেছে, 'ঘটনা শুনছো? তোমার
মেয়ে তো আর ভার্জিন নাই। দোষ সোহাইলের। ও তোমার মেয়েরে ফুসলাইছে। এখন কি আর
বিয়ে দেয়া যাবে? বরপক্ষ শুনলে তো আমার ছোট বোনের মত বিয়ে ভেঙে দিবে। আমি
এতো কষ্ট করে মেয়েরে সৎ থাকতে শিখাই আর আজ সোহাইলের জন্য কি সর্বনাশ হলো।'
.
আমি আঙ্কেলের কোনো দোষ দেব না। উনি ভার্জিনের আসল মানে জানতেন। এখানে বাবা হিসাবে উনার আসলেই কোনো দোষ নাই।
.
সুতরাং আমি হাসপাতালে ভর্তি। তিনদিন আইসিইউতে থাকার পর জেনারেল ওয়ার্ডে
ট্রান্সফার হইছি। ডাক্তার বলেছে এ যাত্রায় বেঁচে যাবো। আরো চার পাঁচদিন পর ঐ
আন্টি আমারে দেখতে আসছে টিফিন কেরিয়ারে খাবার নিয়ে। এসে বলতেছে, 'পুরোটাই
ভুল বোঝাবুঝি হইছে। এখন আমি বুঝতে পারছি ভার্জিনিটি মানে সৎ না। আমি আসলে
স্যরি।'
আমি ক্লান্ত গলায় বললাম, 'ইটস ওকে।'
আন্টি মুচকি হেসে খাবারের বাটি খুলতে খুলতে বলছে, 'তুমি নুডস চাইছিলা সেদিন, তোমার জন্য আমার স্পেশাল নুডস আনসি।'
.
পাশে বয়স্ক এক নার্স ছিলো। দেখি বিড়বিড় করে বলতেছে, 'নাউজুবিল্লাহ। নাউজুবিল্লাহ।'
0 Comments